আজ পাখরির বাজারে গরু বিক্রি করে টাকা নেওয়ার সময়…
আজ পাখরির বাজারে গরু বিক্রি করে টাকা নেওয়ার সময়…
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বগুড়ার পশুর হাটগুলোতে এখন চলছে কোটি টাকার বাণিজ্য। জেলার ছোট-বড় অর্ধশতাধিক হাটে জমে উঠেছে পশু কেনাবেচা। তবে এ ব্যস্ততার মধ্যেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের নতুন ভোগান্তির নাম হয়ে উঠেছে ‘হাসিল সন্ত্রাস’। সরকার নির্ধারিত হার তোয়াক্কা না করে গরু ও ছাগলপ্রতি অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে জেলার প্রায় সব বড় পশুর হাটে।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, পশুর হাটে হাসিল আদায়ের হার নির্ধারিত। স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী গরু, মহিষ ও বড় পশুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং ছাগল-ভেড়ার ক্ষেত্রে তার চেয়ে কম হারে হাসিল আদায়ের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বগুড়ার বিভিন্ন হাটে নির্ধারিত হারকে অনেকটাই অগ্রাহ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের।
শনিবার (২৩ মে) বিকেলে বগুড়া সদর উপজেলার সাবগ্রাম পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি গরু বিক্রিতে ক্রেতার কাছ থেকে ১ হাজার টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ একটি গরুতেই মোট ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অথচ সরকার নির্ধারিত হারের তুলনায় এটি কয়েকশ টাকা বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ছাগলের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। প্রতি ছাগলে ক্রেতার কাছ থেকে ৫০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
হাসিল আদায়ের দায়িত্বে থাকা মোকছেদুল ইসলাম বলেন, হাসিল যেভাবে নিতে বলা হয়েছে সেভাবেই নিচ্ছি। বেশি কেন আদায় করা হচ্ছে তা ইজারাদার বলতে পারবে।
কোরবানি উপলক্ষে জমে উঠছে পশুর হাট/ ছবি: জাগো নিউজ
গরুর হাসিল আদায়কারী সাগর। তিনি বলেন, ইজারাদার যেটা ঠিক করেছে, সেটা নিচ্ছি। প্রতিটি মেমোতে কমিশন আছে। আমরা শুধু আদায়কারী। নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সাবগ্রাম হাটের ইজারাদার আব্দুল কাইয়ুম সরকার বলেন, ১ কোটি ৫ লাখ ৩ হাজার টাকা দিয়ে হাট ইজারা নিয়েছি। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ১০ শতাংশ আয়কর ও ১০ শতাংশ জামানত দিতে হয়। বাজার পরিস্থিতিও খুব ভালো না। লোকসানের ঝুঁকি আছে। তাই সরকারি রেটে হাসিল নেওয়া সম্ভব না।
‘১ কোটি ৫ লাখ ৩ হাজার টাকা দিয়ে হাট ইজারা নিয়েছি। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ১০ শতাংশ আয়কর ও ১০ শতাংশ জামানত দিতে হয়। বাজার পরিস্থিতিও খুব ভালো না। লোকসানের ঝুঁকি আছে। তাই সরকারি রেটে হাসিল নেওয়া সম্ভব না’
রসিদে হাসিলের পরিমাণ না লেখার বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ চাইলে লিখে দেই, না চাইলে লিখি না।
তবে দেখা গেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রসিদে হাসিলের পরিমাণ লেখা হচ্ছে না। শুধু পশুর দাম ও নাম উল্লেখ থাকছে। এতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সদরের ধাওয়াপাড়া এলাকার রেজা ১২ হাজার ৫০০ টাকায় একটি ছাগল কিনে ৫০০ টাকা হাসিল দিয়েছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একটা ছাগলের জন্য ৫০০ টাকা হাসিল কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। বাধ্য হয়েই দিতে হচ্ছে।
চার সংকটে দুশ্চিন্তায় রাজারহাটের চামড়া ব্যবসায়ীরাচট্টগ্রামে সংকট নেই কোরবানির পশুর, দাম আয়ত্তে থাকার আশাঈদ এলেই বাড়ে জাল নোটের কারবার, সরব প্রতারক চক্রহঠাৎ ডিমের দাম বৃদ্ধি, সংকট নাকি সিন্ডিকেট?
আবার ছাগল বিক্রি করতে আসা ছাইফুল ইসলাম বলেন, আগে শুধু ক্রেতার কাছ থেকে নিত। এখন বিক্রেতার কাছ থেকেও নিচ্ছে। একটা গরু বা ছাগল বিক্রি করে টাকা না দিয়ে হাট থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই।
শুধু সাবগ্রাম নয়, মহাস্থানহাটেও একই চিত্র। সেখানে গরুপ্রতি ক্রেতা ও বিক্রেতার কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত হাসিল নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বগুড়ায় পশুর হাটে গরুর পাশাপাশি চাহিদা আছে ছাগলের/ ছবি: জাগো নিউজ
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, গরুর দাম যাই হোক না কেন, নির্দিষ্ট অঙ্ক ধরেই টাকা নেওয়া হচ্ছে।
মহাস্থানহাটে গরু বিক্রি করতে আসা এক খামারি বলেন, অনেকগুলো গরু বিক্রি হয়। এরপরও হাসিল না দিলে খারাপ ব্যবহার করে। প্রতিবাদ করলে ঝামেলা করে।
‘১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় একটি ষাঁড় কিনেছি। হাটে ইজারাদারের লোকজনকে হাসিল দিতে হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা। বিক্রেতা সদর উপজেলার টেংরা গ্রামের শামিম হোসেনকেও হাসিল দিতে হয়েছে ২০০ টাকা’
সরেজমিনে দেখা যায়, হাটে প্রবেশের পর কয়েকজন লোক একসঙ্গে ঘিরে ধরে টাকা আদায় করছে। কেউ প্রশ্ন তুললে রসিদ দিতে দেরি করা, পশু ওঠানো-নামানো নিয়ে ঝামেলা কিংবা উচ্চস্বরে কথা বলার অভিযোগও রয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে শহরের সাবগ্রাম, ঘোড়াধাপ, জয়বাংলা হাট, শেরপুরের ভবানীপুর হাট, দুপচাঁচিয়ার তালোড়া ও ধাপের হাট, নন্দীগ্রামের ভাটরা হাট, কাহালুর মালঞ্চা হাট ও গাবতলীর কয়েকটি পশুর হাট নিয়েও।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদ সামনে রেখে পশুর হাটে এখন কার্যত ‘হাসিল সিন্ডিকেট’ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
খামারিদের অভিযোগ, অতিরিক্ত হাসিলের চাপ শেষ পর্যন্ত পশুর দামের ওপরই প্রভাব ফেলছে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রকৃত খামারির লাভ কমে যাচ্ছে।
জানা গেছে, এবার কোরবানির পশুর হাটে বড় গরুর জন্য ৮০০ এবং ছোট গরুর জন্য ৬০০ টাকা হারে হাসিল আদায়ের হার নির্ধারণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এ হাসিল আদায় করার কথা পশু ক্রেতার কাছ থেকে। কিন্তু হাটের ইজারাদারের লোকজন প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সেই নির্দেশনা তোয়াক্কা না করে গরুর ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা করে হাসিল আদায় করছেন। ছাগলের হাসিল আদায় করা হচ্ছে ৭০০ টাকা।
বগুড়ার অন্যতম বৃহৎ পশু কেনাবেচার হাট বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান পশুর হাটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গরু কিনতে হাটে ভিড় করেন ব্যবসায়ী, ব্যাপারী ও ক্রেতারা। তারা এ হাট থেকে গরু কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ফেনীসহ বড় বড় শহরের পশুর হাটে সরবরাহ করেন।
খাল খননের সুযোগে চলছে গাছ কাটার মহোৎসবনারায়ণগঞ্জে ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় গোলাপি মহিষজমে উঠছে পশুর হাট, চাহিদা বেশি মাঝারি গরুরমৌলভীবাজারে ক্রেতাদের আকর্ষণ ছোট-মাঝারি গরু
হাটে কোরবানির গরু কিনতে আসা সূত্রাপুর এলাকার মিজান সরকার বলেন, ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় একটা ষাঁড় কিনেছি। হাসিল দিতে হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা। বিক্রেতা সদর উপজেলার টেংরা গ্রামের শামিম হোসেনকেও হাসিল দিতে হয়েছে ২০০ টাকা।
গরু বিক্রির জন্য হাটে ক্রেতার অপেক্ষায় খামারি/ ছবি: জাগো নিউজ
মহাস্থান হাটের ইজারাদার আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ হাটে বছরজুড়ে ক্রেতার কাছ থেকে ৭৫০ এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ১০০ টাকা হাসিল আদায় করা হয়। ঈদ উপলক্ষে একটু বেশি হারে হাসিল আদায় হচ্ছে।
বিক্রেতার কাছ থেকে হাসিল আদায়ের কথা স্বীকার করে ইজারাদার বলেন, সব হাটেই ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই হাসিল আদায় হয়। অন্যরা আদায় করছে, আমিও করছি।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান বলেন, গরুর ৮০০ ও ৬০০ এবং ছাগল বা ভেড়ার জন্য ২৫০ টাকা হাসিল বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি হাসিল আদায়ের সুযোগ নেই। আমরা ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।
‘ইজারাদার যেটা ঠিক করেছে, আমরা সেটা নিচ্ছি। প্রতিটি মেমোতে আমাদের কমিশন আছে। আমরা শুধু আদায়কারী। নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই’
তবে ক্রেতা-বিক্রেতারা বলেন, অনেক অভিযোগের পরও মাঠে প্রশাসনের দৃশ্যমান তদারকি খুব কম। বিভিন্ন হাটে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মনিটরিং টিমের উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায় না।
পশুর হাট মনিটরিং ও অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে জেলার প্রায় সব পশুর হাট গবাদিপশুতে পরিপূর্ণ। ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দামের পশু উঠেছে হাটগুলোতে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কেনাবেচা। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগও।
ক্রেতা-বিক্রেতাদের দাবি, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, রসিদে বাধ্যতামূলকভাবে হাসিলের পরিমাণ উল্লেখ এবং সরকারি তালিকা প্রকাশ্যে টানানো না হলে এই ‘হাসিল সন্ত্রাস’ বন্ধ হবে না
🎁 Your Special Offer is Loading...
Please wait a moment. You'll be redirected automatically after the countdown.
10s
⏳ Stay here — your offer will open in a new page.
✅ Redirect happens only once per session.

Comments
Post a Comment